অস্ট্রেলিয়ায় 'অত্যধিক পানি পানের আশঙ্কায়' দশ হাজার উট হত্যার খবরে একটি কোরআনের ইতিহাস মনে পড়লো। ইতিহাসে অত্যধিক পানি পানের অভিযোগ তুলে উট হত্যার ঘটনা সম্ভবত ছামুদ জাতির পর এটাই প্রথম।
আদ জাতির পতনের পর তামাম আরব উপদ্বীপে শৌর্যশালী জাতি হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ছামুদ জাতির। সামরিক, অর্থনৈতিক ও শিল্পকলায় সমৃদ্ধির শিখরে যতদিনে তারা পৌঁছে গিয়েছিল- ততদিনে তাদের নৈতিকতা নেমে ঠেকেছিল একদমই তলানিতে।
মূর্তিপূজা, কুপ্রথা ও নানাবিধ পাপাচারের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল।
ছামুদ জাতি প্রধানত আরব উপদ্বীপের উত্তরাংশে বসতি গড়েছিল। তারা পাথুরে পাহাড় কেটে সুন্দর সুন্দর বাড়ি নির্মাণ করতে জানত।
সৌদি আরবে এখনও তাদের গড়া ১১১ টি মনুমেন্টাল গম্বুজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে বিস্তৃত আল হিজর শহর তাদেরই নির্মিত। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর গ্রীক ইতিহাসবিদ লিনির রচনা থেকেও এর প্রমাণ মেলে।
আল্লাহ তাদেরকে এই বিপথগামীতা থেকে সাবধান করার জন্য সালিহ আ. কে নবী হিসেবে প্রেরণ করলেন। সালিহ আ. তাঁদের সতর্ক করলেন, দ্বীনের দাওয়াত দিলেন। খুব স্বল্পসংখ্যক লোক তা ঈমান আনলো। বাকিরা প্রত্যাখ্যান করলো।
সালিহ আ. আল্লাহর অবাধ্যতার কী পরিণতি তা তাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন। পূর্ববর্তী আদ জাতি ও নূহ আ. এঁর জাতির ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানালেন। ছামুদ জাতির শাসক এবং অভিজাত শ্রেণি সম্পূর্ণ রূপে সালিহ আ. এঁর এই দ্বীনের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলো।
তাঁরা সালিহ আ. এঁর উপর নানা অপবাদ আরোপ করতে লাগলো এবং তাঁর অনুসারীদের উপর অত্যাচার শুরু করলো। একদিন তারা পাহাড়ের একটা পাথর দেখিয়ে বললো, সালিহ যদি সত্যিই এক আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হন তবে যেন এই পাথরের মাঝখান থেকে একটা দশ মাসের গর্ভবতী উটনী বের করে আনেন।
তারা কথা দিল, যদি একটা সুন্দর, লম্বা, স্বাস্থবান উটনী বেরিয়ে আসে তবে তারা সালিহ আ. এঁর দ্বীন কবুল করবে।
আল্লাহর ইচ্ছেয় সালিহ আ. এঁর কথামতো সেখান থেকে উটনী বেরিয়ে এলো। বেরিয়েই একটা বাচ্চাও প্রস্রব করলো।
এর পরও ছামুদ জাতির লোকেরা ঈমান আনতে অস্বীকার করলো। পরন্তু অবাধ্যতা ও প্রত্যাখ্যানের প্রতিক হিসেবে তারা উটনীটিকে হত্যার পায়তারা করতে লাগলো। এই উটনীটি প্রচুর দুধ দিত। যা পুরো শহরবাসীর জন্য যথেষ্ট ছিল৷
প্রচুর দুধ দেওয়ার দরুণ উটনীটি প্রচুর পরিমাণে পানিও পান করত। ছামুদ জাতির লোকেরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অভিযোগ আনলো যে, এই উটনীর অত্যধিক পানি পানের ফলে অন্য গবাদিপশু পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই এই উটনীকে হত্যা করতে হবে।
সালিহ আ. তাদেরকে সাবধান করলেন। বললেন, এই উটনীকে হত্যা করলে আল্লাহর গযব নেমে আসবে। তারা তা কানে তুললো না। শাসকের উৎসাহে সাত জনের একটা দল উটনীকে হত্যা করতে গেল। উটনী পানি পানের সময় প্রথমে পায়ে তীর ছুঁড়লো। এরপর তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করলো।
হত্যার পর তারা সালিহ আ.কে নিয়ে উপহাস করতে লাগলো। বললো, কোথায় সেই আজাব? সালিহ আ.কে তারা মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করলো। সালিহ আ. দরদের সাথে আবারও দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে গেলেন। বললেন, আল্লাহর গযবের চেয়ে রহম দ্রুতগামী- তাই তোমরা তওবা করো। নতুবা তিন দিনের মধ্যে আল্লাহর গযব তোমাদের গ্রাস করবে৷
লোকেরা তা নিয়েও তামাশা করতে লাগলো। সালিহ আ. তাঁর অনুসারীদের নিয়ে শহর ত্যাগ করলেন। তিনদিন পর প্রবল ভূমিকম্প আঘাত হানলো। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট অগ্নুৎপাত তাদের পুরো জাতিকেই ছাই করে দিয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ায় 'অত্যধিক পানি পানের আশঙ্কায়' দশ হাজার উট হত্যার খবরে এই কোরআনি ইতিহাস মনে পড়লো। ইতিহাসে অত্যধিক পানি পানের অভিযোগ তুলে উট হত্যার ঘটনা সম্ভবত ছামুদ জাতির পর এটাই প্রথম।
তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, গৃহপালিত প্রাণী খাওয়ার জন্য (এমনকি চ্যারিটি হিসেবে) আল্লাহর নামে কোরবানি করলেও যে বঙ্গীয় সেক্যুলারদের সাময়িক পশুপ্রীতিতে অনলাইন ভাসে, তাদের কাউকেই এই ইস্যুতে উচ্চবাচ্য করতে দেখলাম না। আহা সেক্যুলারিজম!
আদতে অস্ট্রেলিয়ায় উট স্থানীয় প্রাণি না। মূলত ইংরেজদের দ্বারা ভারত, আফগানিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে থেকেই উট সেখানে নেওয়া হয় এবং পরে এর বিস্তার ঘটে।
ইউরোপেও মুসলিম দেশগুলো থেকেই উট প্রথম ঢোকে। আমার মনে হয়, আদতে উটের এই 'ন্যাশনালিটি ক্রাইসিস' না থাকলে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে এইভাবে বনের উট হত্যা সম্ভব ছিল না। নানা জায়গা থেকেই এ বাঁধা আসত এবং প্রশ্ন উঠত।
সে যাই হোক, ইতিহাস নানাভাবেই বারবার ফিরে আসে। আদ জাতিকে ধ্বংসের পূর্বে আল্লাহ নূহ আ. এঁর জাতির ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে বলেছিলেন। ছামুদ জাতির জন্য ছিল নূহ ও আদ জাতির ইতিহাস। আর আমাদের জন্য কোরআন নূহ, আদ, ছামুদ জাতির ইতিহাস তুলে সাবধান করেছে।
কিন্তু দূর্ভাগ্য এটাই যে, অন্যসব গযবে নিপতিত জাতির মত আমরাও আল্লাহর সেই সাবধান বাণীকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞার দুঃসাহস দেখিয়ে চলেছি। আল্লাহ আমাদের পূর্ববর্তীদের থেকে শিক্ষা নেবার তাওফিক দিন।
#আমীন!
©naseehah


0 Comments